শনিবার, ১১ Jul ২০২৬, ০৬:০৮ পূর্বাহ্ন

পাগলির কোলে চাঁদের আলো, দত্তক নিতে ২০ আবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম : প্রায় এক সপ্তাহ আগে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সংগ্রামপুর ইউনিয়নের বোয়ালীহাটবাড়ি এলাকায় আসে মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারী। অন্তঃসত্বা।

গত শনিবার (১৩ জুন) রাত ৮টার দিকে ফুটফুটে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন তিনি। এই সন্তানের বাবা কে? এই প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মনে। শুধু তাই নয়, মা মানসিক ভারসাম্যহীন ও ভবঘুরে হওয়ায় নবজাতক এই শিশুর ভবিষ্যত নিয়েও শংঙ্কিত তারা।

তবে ইতোমধ্যেই প্রায় ২০টি পরিবার শিশুটিকে দত্তক নিতে চেয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, গত ৬-৭ দিন ধরে মানসিক ভারসাম্যহীন ওই নারী বোয়ালীহাটবাড়ি এলাকায় ঘোরাঘুরি করতো। রাতে বোয়ালী হাটবাড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় ঘুমাতো। গত শনিবার সন্ধ্যার পর তার প্রসব বেদনা ওঠে। এসময় তার গোঙ্গানী শুনতে পেয়ে স্থানীয় নৈশ্যপ্রহরী আব্দুল্লাহ এগিয়ে যান। সেসময় ওই নারীর প্রসব বেদনার বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি ওই এলাকার শাহজাহানের স্ত্রী গ্রাম্য দাই হিসেবে পরিচিত সাজেদা বেগমকে ডেকে আনেন। পরে ওই স্কুলের বারান্দাতেই সাজেদা বেগমের হাতে জন্ম নেয় ফুটফুটে শিশুটি।

নৈশপ্রহরী আব্দুল্লাহ বলেন, ‘শিশুটির জন্মের পর আযান দিয়েছি। নিজের নামের সাথে মিলিয়ে নাম রেখেছি আব্দুল্লাহ। ওই রাতে সাজেদা সারারাত ওই পাগলীকে পাহারা দিয়েছে। পরে সকালে স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আব্দুল রহিম মিয়াসহ স্থানীয়রা তার খোঁজ নিয়েছেন। ইউএনও মহাদয় নিজে এসেছেন। মা ও সন্তানের খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। হয়তো শিশুটি সুস্থ আছে, তার মাও সুস্থ আছে। কিন্তু শিশুটির পরিচয় কী হবে?’

স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম মিয়া জানান, গত দুই থেকে আড়াই সপ্তাহ আগেও ওই নারীকে চাপড়া বাজার এলাকায় দেখা যেতো। ৫-৬ দিন আগে সে কি মনে করে এই এলাকায় চলে আসে। সে নিজের পরিচয় বলতে পারে না। বাড়ির ঠিকানাও বলতে পারে না। শিশুর বাবা কে, সেটিও সে জানাতে পারেনি। তার কথাবার্তা অসংলগ্ন। তবে তার কথায় কুমিল্লা বা চাঁদপুর অঞ্চলের টান রয়েছে। তার বাড়ির ঠিকানা জানতে চাইলে সে গ্রামের নাম কয়ারগাছী বলছে। উপজেলার নাম বলছে কোটচাঁদপুর। আর তার নাম একবার ছালমা, একবার রেজাউল আর একবার সেলিনা বলছে।’

ঘাটাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অঞ্জন কুমার সরকার বলেন, ‘‘ওই ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও স্থানীয় মাধ্যমে এমন ঘটনা শোনার পরই নবজাতকের জন্য প্রসাধনী সামগ্রী, কয়েক সেট পোশাক, গুঁড়ো দুধ ও তার মায়ের জন্য নতুন শাড়ি ও ফল নিয়ে সেখানে যাই। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে ওই স্কুলের একটি কক্ষে মা ও শিশুর থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তার দেখাশোনার জন্য দাই সাজেদা বেগমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি সার্বক্ষণিক স্বেচ্ছায় ওই নারীর পাশে থাকছেন।

‘পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাইফুল রহমান খানের সহায়তায় নবজাতককে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের পরামর্শে ওই নারীকে প্রসব পরবর্তী ওষুধ ও চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’’

তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যেই স্থানীয় ২০টি পরিবার ওই শিশুটিকে দত্তক নেওয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নৈশ্যপ্রহরী আব্দুল্লাহ ও সাজেদা বেগমের মতো মানবতার সেবায় এগিয়ে আসা নিঃস্বার্থ মানুষদের জন্য আমরা গর্বিত। আমি বুঝতে পারছি না, আব্দুল্লাহ বা সাজেদা বেগমের মতো নিঃস্বার্থ সাহায্যকারীদের বীরত্বের কথা ভেবে গর্ববোধ করব? না কি পাগলিটাকে মা বানিয়ে দেওয়া ওই নরপিশাচটার কথা ভেবে লজ্জিত হব?’

নগরকন্ঠ.কম/এআর

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com